আমি রাফি। মগবাজারের ওয়্যারলেস মোড়ের এই চারতলা বাড়িটার তিনতলায় একা থাকি। বয়স আঠাশ। পেশায় ফ্রিল্যান্স রিপোর্টার, কিন্তু আসল নেশা আমার একটা ব্লগ। নাম দিয়েছি “ঢাকার অন্ধকার”। ঢাকার পুরনো বাড়ি, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, থানায় চাপা পড়ে যাওয়া জিডি নিয়ে লিখি। ভাড়া কম বলে এই বাড়িতে আছি পাঁচ বছর। বাড়িটা পঁয়ত্রিশ বছরের পুরনো। দেয়ালে শ্যাওলা, সিঁড়িতে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।
আমার ঘুম অনেকদিন ধরেই খারাপ। গত তিন মাস আগে একটা লম্বা সম্পর্ক ভেঙেছে। তারপর থেকে রাত জাগা অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু গত পাঁচ রাত ধরে যা হচ্ছে, তা আমার জীবনের সব হিসাব এলোমেলো করে দিয়েছে। বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প
প্রতি রাতে ঠিক ২টা ১৩ মিনিটে আমার ফোন বাজে।
প্রথম রাতে ভেবেছি ঘুমের ঘোরে শুনছি। স্ক্রিনে লেখা Unknown Number। ধরতেই ওপাশ থেকে একটা মেয়ের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপর ফিসফিস করে একটা লাইন, “আলোটা নিভিয়ে দিন প্লিজ। ওরা দেখে ফেলবে।”
আমি হ্যালো হ্যালো করলাম। কোনো উত্তর নেই। লাইন কেটে গেল।
দ্বিতীয় রাতেও একই সময়, একই কণ্ঠ। এবার আমি একটু রেগে জিজ্ঞেস করলাম, কে আপনি? কোন আলো?
মেয়েটা এবার একটু জোরে বলল, “তিন বি-র আলোটা। প্লিজ নিভিয়ে দিন।”
আমার ঠিক উপরের ফ্ল্যাটটাই ৩বি। গত পাঁচ বছর ধরে তালাবন্ধ। বাড়ির মালিক আমেরিকায় থাকেন বলে জানি। আমরা নিচের ভাড়াটিয়ারা কেউ কোনোদিন ওই ফ্ল্যাটের দরজা খুলতে দেখিনি।
তৃতীয় রাতে আমি কলটা রেকর্ড করলাম। রেকর্ডে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে মেয়েটার গলা, কিন্তু পেছনে আরেকটা শব্দ আছে। কেউ যেন টেনে টেনে একটা ভারী চেয়ার সরাচ্ছে, আর দূরে একটা গাড়ির হর্ন, তিনবার।
সকালে আমি জিপি অফিসে ফোন দিলাম। তারা ট্রু কলার লগ চেক করে বলল, এই ধরনের কোনো নাম্বার থেকে তাদের নেটওয়ার্কে গত এক মাসে কোনো কল জেনারেটই হয়নি। মানে কলটা টেলিকম নেটওয়ার্ক দিয়ে আসেইনি। বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প
তাহলে আসছে কোথা থেকে?
আমাদের বাড়ির কেয়ারটেকার জলিল চাচার বয়স ষাটের ওপর। এই বাড়িতে তিনি বিশ বছর ধরে আছেন। আমি তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে রেকর্ডটা শোনালাম। শুনেই তার মুখ সাদা হয়ে গেল। হাত থেকে চায়ের কাপ প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“রাফি ভাই, এই ফ্ল্যাটের কথা আর মুখে আইনেন না। বিপদ হইব।”
অনেক জোরাজুরির পর তিনি যা বললেন, তা রেকর্ডের চেয়েও ভয়ংকর।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৩বি-তে থাকত আনিস সাহেবের ফ্যামিলি। তার একটাই মেয়ে, সামিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় পড়ত, আমার মতোই ব্লগ লিখত। খুব জেদি আর একরোখা মেয়ে ছিল। তার নিজের মা মারা যাওয়ার পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তখন থেকেই বাড়ির দলিল নিয়ে সৎ মায়ের সাথে তার প্রায়ই ঝগড়া হতো। এই বাড়িটা সামিরার মায়ের নামে ছিল। বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প
এক রাতে, প্রচন্ড ঝড়ের রাতে, সামিরা হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। আনিস সাহেব থানায় জিডি করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরদিন সকালেই তার সৎ স্ত্রী এসে জিডি তুলে নেন। বলেন, মেয়ে তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে পালিয়ে গেছে। এর এক মাস পর পুরো ফ্যামিলি বাড়ি ছেড়ে আমেরিকা চলে যায় বলে আমরা জানি। সেই থেকে ফ্ল্যাট তালাবন্ধ।
“আর ওই আলো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
জলিল চাচা ফিসফিস করে বললেন, “গত দেড় মাস ধরে রাত দুইটার পর ওই ফ্ল্যাটে আলো জ্বলে। আমি ভাবছি আমার চোখের ভুল। আপনিও দেখেন?”
ওইদিন বিকেলে আমি জাতীয় গ্রন্থাগারে গেলাম। পুরনো পত্রিকার আর্কাইভ ঘেঁটে ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের একটা ছোট কলাম পেলাম। “মগবাজার থেকে ব্লগার তরুণী নিখোঁজ, পরিবারের দাবি প্রেমঘটিত”। সাথে সামিরার ছবি। হাসিখুশি একটা মেয়ে, চোখে চশমা। ছবিটা দেখে আমার হাত কেঁপে উঠল। এই মেয়েটাকেই আমি গতকাল রাতে স্বপ্নে দেখেছি। বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প
আমি ওই ব্লগের লিংক খুঁজে বের করলাম। সামিরার শেষ পোস্ট ছিল ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। শিরোনাম ছিল, “যদি আমি হঠাৎ হারিয়ে যাই”। ভেতরে লেখা ছিল, “আমার সৎ মা আমার বাবাকে ভয় দেখিয়ে সব সম্পত্তি তার ভাইয়ের নামে লিখে নিতে চায়। আমি বাধা দিয়েছি। আমার মনে হচ্ছে ওরা আমাকে আটকে রাখবে। যদি আমি হারিয়ে যাই, তাহলে জানবেন আমি পালাইনি। আমাকে খুঁজবেন ফ্ল্যাট ৩বি-তেই।” বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প
আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল।
চতুর্থ রাত। আমি ঘুমালাম না। দুটো ব্ল্যাক কফি বানিয়ে টেবিলে বসলাম। লাইট নিভিয়ে জানালা দিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে বসে থাকলাম। দেয়াল ঘড়িতে ২টা ১২ বাজে। আমার বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটাচ্ছে। বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প
ঠিক ২টা ১৩ মিনিটে ফোনটা বাজল।
আজ আমি ধরলাম না। আমি দেখলাম ৩বি ফ্ল্যাটের ভেন্টিলেটর দিয়ে সত্যিই হলুদ আলো বের হচ্ছে। কেরোসিনের হারিকেনের আলো, যেমনটা গ্রামে দেখা যায়। আমি ফোনটা পকেটে নিয়ে টর্চ ছাড়া ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম।
৩বি-র দরজার সামনে এসে দেখি তালাটা আগের মতোই বাইরে থেকে ঝুলছে, কিন্তু দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে আলোর রেখা আসছে। আমি দরজায় কান পাতলাম। ভেতর থেকে খসখস করে লেখার শব্দ আসছে। আমি আস্তে ধাক্কা দিলাম। দরজাটা খুলে গেল। তালাটা আসলে নকল। বাইরে থেকে তালা ঝুলছে, কিন্তু ভেতরের ছিটকিনি খোলা।

ভেতরে ঢুকতেই ধুলো আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। সব আসবাব সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা। শুধু মাঝের ঘরে একটা টেবিলে হারিকেন জ্বলছে। টেবিলে বসে একটা মেয়ে পেছন ফিরে ডায়েরিতে কিছু লিখছে। তার পরনে একটা ময়লা সাদা সালোয়ার, চুল এলোমেলো।
“সামিরা?” আমি ফিসফিস করে ডাকলাম।
মেয়েটা চমকে উঠল। সে সামিরাই। পত্রিকার ছবির মেয়েটা, কিন্তু পাঁচ বছর আগের চেয়ে অনেক শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে গভীর কালি।
সে আমাকে দেখে চিৎকার করল না, বরং দৌড়ে এসে আমার মুখ চেপে ধরল। “আপনি কেন আলো জ্বালিয়ে এসেছেন? টর্চ নিভিয়ে দিন। ওই সামনের বাড়ির জানালা দিয়ে ওরা দেখে ফেলে।”
“কারা ওরা?”
“আমার সৎ মা আর তার ভাই। তারা প্রতিদিন রাত দুটোর পর নিচে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে আমি বেঁচে আছি কিনা।”
এরপর সামিরা যা বলল, তা শুনে আমার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল।
সামিরা সেদিন পালিয়ে যায়নি। তাকে তার সৎ মা আর মামা মিলে এই ফ্ল্যাটেই আটকে রেখেছিল। কারণ এই বাড়ির আসল দলিল সামিরার মায়ের নামে ছিল। সামিরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় দলিল এখন তার নামে। তাকে ভয় দেখিয়ে সই করানোর জন্য এই ফ্ল্যাটে আটকে রাখা হয়। একদিন রাতে প্রচন্ড ঝগড়ার সময় সামিরার বাবা আনিস সাহেব স্ট্রোক করে ওই ঘরেই মারা যান। সৎ মা সেটাকে ধামাচাপা দিতে লাশ গুম করে ফেলে এবং প্রচার করে সামিরা পালিয়ে গেছে। তারপর তারা আমেরিকা চলে যাওয়ার নাটক করে দেশের ভেতরেই অন্য কোথাও আত্মগোপন করে। বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প
“তাহলে তুমি পাঁচ বছর ধরে এখানেই?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“না। আমি দুই বছর আটকে থাকার পর একদিন জলিল চাচার সাহায্যে পালিয়েছিলাম। একটা এনজিওতে ছিলাম। কিন্তু এক মাস আগে ফিরে এসেছি। কারণ আমার বাবার লাশটা এই ফ্ল্যাটের ভেতরেই আছে। আমি জানি ওরা লাশ সরায়নি, কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। আমি সেটা খুঁজতে এসেছি। আর এই পুরনো ইন্টারকমের লাইনটা এখনো আমার ফ্ল্যাটের সাথে আপনাদের ফ্ল্যাটের লাইন ক্রস করা। আমি রাতে ওই লাইন দিয়েই কল দিতাম। যদি কেউ ধরে। চার রাত ধরে আপনিই ধরেছেন।”
কথাটা বলেই সে দেয়ালের একটা আলমারি সরাল। পেছনে একটা ছোট দরজা। আগে কখনো খেয়াল করিনি। দরজাটা খুলতেই ভেতর থেকে তীব্র বোটকা গন্ধ বের হলো। ভেতরে একটা ছোট স্টোর রুম। আর সেখানে একটা পুরনো লোহার ট্রাঙ্ক, তালা মারা।
আমার বমি আসছিল। সামিরা কাঁপা হাতে ট্রাঙ্কের তালাটা একটা লোহার রড দিয়ে ভাঙল। ভেতরে কিছু হাড়, একটা ছেঁড়া পাঞ্জাবি আর একটা পুরনো হাতঘড়ি। ঘড়িটা এখনো টিকটিক করছে। সময় ২টা ১৩ মিনিটে আটকে আছে। বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প
ঠিক তখনই নিচে একটা গাড়ির হর্ন বাজল। তিনবার। আগের রেকর্ডের মতোই। সামিরার মুখ সাদা হয়ে গেল। “ওরা এসে গেছে। আজ আমার সৎ মামা আসবে। আজই দলিলে সই না করলে আমাকে মেরে ফেলবে বলেছে।”
নিচে থেকে জোরে দরজা ধাক্কানোর শব্দ। জলিল চাচার গলা, কিন্তু কাঁপছে, “সামিরা মা, দরজা খোলো। ম্যাডাম এসেছেন।”
সামিরা আমার হাত শক্ত করে ধরল। আমি দ্রুত হারিকেন নিভিয়ে দিয়ে ওকে নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। বাথরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে ছাদের পাইপে ওঠা যায়, এটা সামিরা আগেই দেখে রেখেছিল।
আমরা যখন পাইপ বেয়ে ভেজা ছাদে উঠছি, তখন দেখলাম ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে দুজন লোক ঢুকছে। একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা, আর একজন মোটা লোক। মহিলার হাতে একটা বড় ছুরি। তারা পুরো ফ্ল্যাট তন্নতন্ন করে খুঁজছে।
ছাদে তখন প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমরা চিলেকোঠার পেছনে লুকালাম। আমার ফোনে তখনো ২টা ২৭ বাজে। আমি আগেই বুদ্ধি করে ৯৯৯-এ মেসেজ দিয়ে লোকেশন শেয়ার করে রেখেছিলাম আর আমার এক পুলিশ সোর্সকে ভয়েস পাঠিয়ে রেখেছিলাম। বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প
লোক দুটো ছাদে উঠে এলো। মহিলাটা চিৎকার করে বলছে, “জানি তুই এখানেই আছিস। তোর বাবার মতো তোকেও এই পানির ট্যাংকিতে ফেলে দেব।”
আমি আর পারলাম না। চিলেকোঠার পেছন থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার করলাম, “এই যে, আমি এখানে।”
তারা আমার দিকে তাকাতেই পেছন থেকে সামিরা একটা লোহার রড দিয়ে মোটা লোকটার মাথায় আঘাত করল। লোকটা পড়ে গেল। মহিলাটা ছুরি নিয়ে সামিরার দিকে তেড়ে এলো। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মহিলাটা পা পিছলে ছাদের কিনারায় চলে গেল। আমি দৌড়ে গিয়ে তার হাত ধরে ফেললাম। নিচে চারতলা। পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত।
ঠিক তখনই ছাদের দরজা ভেঙে পুলিশ ঢুকল। সাথে জলিল চাচা।
পরদিন সকালে পুলিশ ফ্ল্যাট ৩বি থেকে আনিস সাহেবের কঙ্কাল উদ্ধার করল। ফরেনসিক বলল, মৃত্যু স্বাভাবিক, কিন্তু লাশ গুম করা হয়েছে। সামিরার সৎ মা আর তার ভাই এখন জেলে। জলিল চাচা রাজসাক্ষী হয়েছে, কারণ তাকে প্রাণের ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছিল।
আজ এক মাস পর। ফ্ল্যাট ৩বি আর তালাবন্ধ নেই। সামিরা ওখানেই থাকে। আমরা দুজন মিলে এখন একটা নতুন ব্লগ চালাই। রাত ২টা ১৩ মিনিটে এখন আর কোনো কল আসে না। বাংলা সাসপেন্স থ্রিলার গল্প
তবে একটা জিনিস এখনো আমি মেলাতে পারি না।
পুলিশ যেদিন ট্রাঙ্কটা খুলেছিল, সেখানে একটা ডায়েরি পেয়েছিল। সেই ডায়েরিটা সামিরার না, তার বাবার। শেষ পাতায় আমার হাতের লেখা ছিল। স্পষ্ট বাংলায় লেখা, “আমি রাফি, আমি সব দেখেছি, কিন্তু টাকার জন্য চুপ করে ছিলাম। আমাকে মাফ করে দিও সামিরা। ২০১৯।”
অথচ ২০১৯ সালে আমি সাংবাদিকতায় ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। আমি এই বাড়ির নামও শুনিনি তখন।
তাহলে ওই লেখাটা কে লিখেছিল? আর আমার হাতের লেখা ওখানে এলো কীভাবে?